কোটি টাকার লেনদেন প্রতিদিন! বাংলাতেই রয়েছে এই ‘লাখপতি রোড’, আপনি কি চেনেন?

কোটি টাকার লেনদেন প্রতিদিন! বাংলাতেই রয়েছে এই ‘লাখপতি রোড’, আপনি কি চেনেন?

 

West Medinipur News: কোনও বিশিষ্ট জন বা স্বাধীনতা সংগ্রামীর আত্মত্যাগের স্মরণে নয়, রোজকার লক্ষ টাকার বিপুল বাণিজ্যের ওপর ভর করেই বেলদার বুকে সগর্বে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে এই ‘লাখপতি রোড’।

বেলদা, পশ্চিম মেদিনীপুর, রঞ্জন চন্দ: সাধারণত শহরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা রাস্তাগুলির নাম রাখা হয় কোনও না কোনও মনীষী, স্বাধীনতা সংগ্রামী কিংবা এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে। মহাত্মা গান্ধী রোড, নেতাজি সুভাষ রোড বা রানি শিরোমণি রোড— এমন নামেই আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু কখনও কি শুনেছেন কোনও রাস্তার নাম ‘লাখপতি রোড’? নামটা শুনে যে কারও ভ্রু কুঁচকে যাওয়াই স্বাভাবিক। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হঠাৎ কেন এমন অদ্ভুত নাম? কে দিলেন এই নাম, আর এর নেপথ্যেই বা কী ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে? স্থানীয়দের মুখে মুখে ফেরা এই লাখপতি রোডের গল্প কিন্তু বেশ চমকপ্রদ।

পশ্চিম মেদিনীপুরের একেবারে প্রান্তিক এক জনপদ এই বেলদা। এককালে এটি ছিল নেহাতই একটি গঞ্জ। ব্রিটিশ আমলে বেলদা স্টেশন তৈরি হওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে এলাকার শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে শুরু করে। এককালের শ্মশানভূমি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে থাকে এক জমজমাট ছোট্ট শহরে। ট্রেনের যাতায়াত শুরু হতেই বেলদার প্রচার ও প্রসার বাড়ে। এই বেলদাকে কেন্দ্র করেই যাওয়া যেত কাঁথি। বেলদা-কেশিয়াড়ি মোড় সংলগ্ন এলাকায় ছিল একটি পুরনো রাস্তা, যা দিয়ে একসময় কাঁথি যাতায়াত চলত। তখন আজকের মত ঝাঁ-চকচকে রাজ্য সড়ক তৈরি হয়নি। এই পুরনো কাঁথি রাস্তাই (ওল্ড কন্টাই রোড) কালের নিয়মে আজ সকলের কাছে ‘লাখপতি রোড’ নামে পরিচিত। কেউ কেউ আবার মজার ছলে একে ‘কোটিপতি রোড’-ও বলে থাকেন।

তবে এই নামের পিছনে কোনও রাজা-জমিদারের গল্প নেই, রয়েছে আদ্যোপান্ত এক ব্যবসায়িক সাফল্যের ইতিহাস। বেলদার প্রসার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে মূলত মাড়োয়াড়ি সম্প্রদায় এবং স্থানীয় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী এই এলাকায় ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেই ব্যবসা ডালপালা মেলে। আজ পশ্চিমবঙ্গ এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্য ওড়িশার তেল ও মশলার ব্যবসার অন্যতম বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই বেলদা। আর সেই ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র হল এই রাস্তাটির দু’পাশ। প্রতিদিন এখানে শয়ে শয়ে মালবাহী গাড়ি লোডিং এবং আনলোডিং হয়। এখান থেকেই মশলা ও তেল বোঝাই ট্রাক পাড়ি দেয় দূর-দূরান্তে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই এলাকায় যে বিপুল পরিমাণ ব্যবসা হয়, তার আর্থিক অঙ্ক কয়েক লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায়। অনেকের মতে, এই লেনদেনের পরিমাণ প্রায় কোটি টাকা ছুঁইছুঁই। প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার ব্যবসা হওয়ার কারণেই স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে এই রাস্তার নাম হয়ে যায় ‘লাখপতি রোড’। রাস্তার একটি বড় অংশ জুড়ে শুধুই ব্যবসায়ীদের বসবাস ও আনাগোনা। প্রতিদিন শতাধিক মানুষ এখানে রুটিরুজির টানে কাজ করেন। গোটা বেলদা শহরেও একত্রে এত বিপুল টাকার লেনদেন হয় না, যা শুধুমাত্র এই একটি রাস্তায় হয়।

পরবর্তীকালে বেলদা থেকে কাঁথিগামী নতুন রাজ্য সড়ক তৈরি হওয়ার পর ভারী যানবাহন ও বাসগুলি সেই মূল পথেই যাতায়াত করতে শুরু করে। ফলে পুরনো কাঁথি রাস্তাটিতে সাধারণ যানজট কমে যায়। বর্তমানে কেবল গ্রামীণ মানুষজনের যাতায়াত এবং এই বিশাল ব্যবসার কাজেই রাস্তাটি ব্যবহৃত হয়। মূল রাস্তার যানজট থেকে মুক্ত হওয়ায় এখানকার ব্যবসার পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সেই সঙ্গেই আরও বেশি করে জনমুখে ছড়িয়ে পড়েছে রাস্তাটির নাম। কোনও বিশিষ্ট জন বা স্বাধীনতা সংগ্রামীর আত্মত্যাগের স্মরণে নয়, রোজকার লক্ষ টাকার বিপুল বাণিজ্যের ওপর ভর করেই বেলদার বুকে সগর্বে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে এই ‘লাখপতি রোড’।

(Feed Source: news18.com)