মুহূর্তের ভুলে ৩ হাজার ফুট গভীর খাদে ২ জন! মাকালু অভিযানে গিয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা পিয়ালি বসাকের

মুহূর্তের ভুলে ৩ হাজার ফুট গভীর খাদে ২ জন! মাকালু অভিযানে গিয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা পিয়ালি বসাকের
সন্দীপ সরকার, কলকাতা: পদে পদে বিপদ। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৫০-৬০ ডিগ্রি নীচে! ঘণ্টায় একশো কিলোমিটার গতিতে বইছে হাওয়া। সঙ্গে ভারগ্লাস আতঙ্ক। স্বচ্ছ কাচের মতো বরফ জমে রয়েছে। পা দিলেই তলিয়ে যেতে হতে পারে গভীর খাদে।

বিপদসঙ্কুল সেই মাকালু অভিযানে গিয়েছেন হুগলির চন্দননগরের পর্বতারোহী পিয়ালি বসাক। মাকালু অভিযানে গিয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। চোখের সামনে প্রায় তিন হাজার ফুট গভীর খাদে পড়ে গিয়েছেন দুই পর্বতারোহী! তাঁদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও খুব কম।

মাকালুর সামিট ক্যাম্প থেকে পিয়ালি ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, ‘খুবই দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। ইরানের পর্বতারোহী আবুল ফজল নিখোঁজ। নেপালের পূর্বা ওয়াঙ্গেল শেরপাও নিখোঁজ। তিন হাজার ফুট নীচে পড়ে গিয়েছেন। ২৭ হাজার ফুট উচ্চতায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।’

ভিডিওতে পিছনের চূড়ার দিকে ইঙ্গিত করে পিয়ালি বলছিলেন, ‘মাকালু সামিট দেখা যাচ্ছে। পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ। প্রায় ২৮ হাজার ফুট উচ্চতা।’

প্রত্যেক পদে প্রতিবন্ধকতা। বিপদের হাতছানি। পিয়ালি বলছিলেন, ‘আজ পর্যন্ত শীতকালে মাকালু অভিযানে কেউ সফল হতে পারেনি। অভিযান খুব ভালভাবে চলছিল। জোরাল হাওয়া। সব সময়ই একশো কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় হাওয়া। তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বেস ক্যাম্পে পৌঁছনোই খুব কঠিন ছিল। চারদিকে আইস ভারগ্লাস। পাথরের ওপর বরফ এমনভাবে জমে থাকে যে, স্বচ্ছ কাচের মতো লাগে। বোঝাই যায় না। পা দিলেই খাদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। শৌচালয়ে জল নেই। পানীয় জল নেই। সব নদী, পাহাড়ি ঝর্না জমে বরফ হয়ে গিয়েছে। ট্রেকিং রুটেও বরফ জমে গিয়েছে। আমরা অ্যাডভান্সড বেসক্যাম্পে পৌঁছেছি। প্রত্যেক দিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা করে ট্রেকিং করছি। মাকালু আরোহন করা টেকনিক্যালি খুব কঠিন। গ্রীষ্মকালেই যাওয়া কঠিন, শীতে তো কার্যত দুর্গম।’

কীভাবে খাদে পড়ে গেলেন দুই পর্বতারোহী? পিয়ালি বললেন, ‘আমরা যেদিন সামিটে যাব, আমার অক্সিজেনটা কাজ করছিল না। আবুল ফজল ও পূর্বা ওয়াঙ্গেল শেরপা স্যর আমাকে নীচে নেমে যেতে বলেন। বলেন ওঁরা নীচে নামলে আমি ওঁদের মাস্ক পরে ওপরে যাব, এমনই পরামর্শ দেন। শীতকালে এত হাওয়ায় অক্সিজেন ছাড়া আরোহন সম্ভব নয়। তিব্বত থেকে শুষ্ক হাওয়া বইছে। কিন্তু ওঁরা সামিট সেরে নামার সময়ই তিন হাজার ফুট নীচে পড়ে যান। উদ্ধারকারী দল খুঁজছে। তবে সেই দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। প্রার্থনা করছি, যেন জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়।’ যোগ করলেন, ‘এখানে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা খুব কঠিন। পায়ের কোনদিকে চাপ দেব, সব শিখতে হয়। পূর্বা ওয়াঙ্গেল স্যরের কাছে শিখেছি অনেক কিছু। ১৯ বার এভারেস্টে উঠেছেন। অন্নপূর্ণায় চড়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বিপদসঙ্কুল পর্বতচূড়া বলা হয় অন্নপূর্ণাকে। কে টু-তে উঠেছেন। এখানে এসে হয়তো চিরতরে হারিয়ে গেলেন পূর্বা ওয়াঙ্গেল।’

পিয়ালি ফিরে আসতে চান না। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও অভিযান শেষ করতে তিনি বদ্ধপরিকর। বলছিলেন, ‘দিন দিন তাপমাত্রা আরও কমে যাচ্ছে। তূবে আমি নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি। খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে, নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে আমার এই অভিযান। তাই পিছিয়ে আসতে ইচ্ছে করছে না। আমাদের খেলায় কোনও দর্শক থাকে না। সেই কারণে স্পনসর থাকে না। পর্বতারোহণ অন্যান্য খেলার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। ঘর-বাড়ি বন্ধক রেখে এসেছি। চেষ্টা করব সামিটে যাওয়ার।’

(Feed Source: abplive.com)